Appleooooo
Active Ranker
মৃত্তিকা: এক অদৃশ্য উপস্থিতির গল্প
লেখিকা: [আপেল]
সে ছিল এক শুভ্র ক্যানভাস — যেন কোনো শিল্পীর তুলি থেমে গিয়েছিল অসময়ের ঠিক আগমুহূর্তে।
ঠোঁটজোড়া গোলাপি কাগজের মতো কোমল, চোখ দুটি অদ্ভুত এক ফ্যাকাসে রঙে রঞ্জিত — যেন বাস্তবের নয়, বরং কোনো কল্পলোকের বাসিন্দা।
তার স্বভাব ছিল বর্ষার মতো — শান্ত, শীতল, গভীর।
তার গলার স্বর মিশে যেত বাতাসে। যেন সে সত্যিই বাতাসের কন্যা—এক অপার রূপসী মৃত্তিকা, যার গায়ের রং যেন নরম বরফ, আর গাল দুটি সদ্য ফোটা পদ্মফুলের মতো।
আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম।
পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
আমাদের আলাপ হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। প্রথমে বন্ধুত্ব হয়, তারপর আস্তে আস্তে আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ি।
প্রতিদিন কথা হতো আমাদের — হাসি-কান্না, রাগ-ভালোবাসায় গাঁথা সম্পর্ক, যা গড়ে উঠেছিল দেখা ছাড়াই।
মৃত্তিকা থাকত অন্য শহরে। তার বাড়ির ঠিকানা জানতাম, তার পরিবারের সঙ্গেও কথা হয়েছে আমার বহুবার।
সে বলত, প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছাদে বাড়ির পেছনের সেই পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে বসে আমার সঙ্গে কথা বলে। এটি তার খুব প্রিয় একটি যায়গা।
খুব বিশ্বাস করতাম আমি তাকে—চোখ বুঁজে, নিঃসংকোচে।
একদিন হঠাৎ কাজ পড়ে গেল সেই শহরে। না জানিয়েই গেলাম। জানালে দেখা করতে চাইত না, তাই... চুপিচুপি গেলাম।
সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই গাছটার নিচে — যেমনটা সে বলত, তেমনই বিশাল, নীরব এক বৃক্ষ।
বাড়ির পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি ফোন করলাম তাকে—রিসিভ করল না।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম অপেক্ষা করলাম।
সময় অল্প ছিল। শেষমেশ দরজায় কড়া নাড়লাম।
দরজা খুললেন এক মাঝবয়সী নারী—মৃত্তিকার মা।
সব বললাম—আমাদের সম্পর্ক, সেই অদেখা ভালোবাসার কথা।
তিনি শুধু তাকিয়ে রইলেন নিঃশব্দে। তারপর বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন আমায়।
ঘরভর্তি নিঃশব্দতা, যেন প্রত্যেকে কিছু জানে, কিন্তু বলতে পারছে না আমায়।
একটা ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন— গোলাপী সাদা রঙে মোড়ানো ঘরটি পুরনো আসবাবে সাজানো, পরিপাটি।
বিছানার পাশে টেবিলটিতে এখনও রাখা তার প্রিয় কফির কাপটি —
সে বলতো রাতে পড়াশোনার ফাঁকে মাঝেমাঝেই সে কফি হাতে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াত,
আকাশপানে তাকিয়ে থাকত একমনে। দেখতো তার প্রিয় কৃষ্ণচূড়া গাছটিকে।
সে বলেছিলো পারফিউম ব্যবহার করত না সে বিশেষ একটি কারনে, কিন্তু একটা বিশেষ পারফিউম খুব পছন্দ তার।
তার সাথে কথা বলার সময় হালকা লোটাসের মিষ্টি একটা গন্ধ সবসময় আমার আশপাশে ছড়িয়ে পড়তো।
দেখলাম ড্রেসিং টেবিলের উপর ছিল একটা ছোট গোলাপি কাচের শিশি — তাতে লেখা “Lotus”।
পেইন্টিং করতে খুব ভালবাসতো মৃত্তিকা তার আঁকা কিছু পেইন্টিং এখনো ফ্রেম করে টাঙানো দেওয়ালে
— ব্যালকনির পাশের জায়গাটিতে একটি ধাতব স্ট্যান্ড, যেটির ওপর চিত্র আঁকার বোর্ড বসানো একটি অসমাপ্ত পেইন্টিং রয়েছে তাতে। পাশের একটি ছোট্ট টেবিলে রাখা রয়েছে রং তুলি।
স্পষ্ট নয়, তবে বোঝা যায়, হয়তো কোনো পুরুষের মুখাবয়ব আঁকা —
আধফোঁটা, অসমাপ্ত।
তখনই হঠাৎ একজন বলে উঠলেন —
“মৃত্তিকা তো আট বছর আগেই মারা গেছে।”
শোনো মাত্রই সব কিছু ঘুরপাক খেতে লাগল মাথার ভিতর।
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম সেই ব্যাক্তির দিকে।
আমাকে তার মৃত্যুসনদপত্র দেখানো হলো।
কিছুক্ষণ পর আমায় একা রেখে বেড়িয়ে গেল তারা।
আমি কিছুতেই কিছু বিশ্বাস করতে পারছি না। কি হচ্ছে এসব? কি বলছেন তারা এগুলো?
ব্যালকনির পর্দার পেছনে হঠাৎ একটা ছায়া সরে গেল —
সঙ্গে ভেসে এল সেই চেনা মিষ্টি সেই লোটাসের সুবাস।
আমি তাকিয়ে দেখলাম — কিছু ছিল না সেখানে। তবু যেন কিছু থেকে গেল।
অদেখা।
ঘরের সব কিছুর মধ্যে তার স্পর্শ ছিল — কোনো কিছুই অযত্নে রাখত না সে।
আজও প্রতিটা জিনিস নিখুঁতভাবে সাজানো, যেন কেউ প্রতিদিন যত্ন করে গুছিয়ে রাখে।
ঘরে ছিল একটা বহু পুরনো আয়না — সেই আয়না সম্পর্কে বলেছিল সে আমায়, “এটা আমার খুব প্রিয়।”
আমি চমৎকৃত হয়ে তাকিয়ে দেখি। কি অপরূপ সুন্দর আয়নাটি।
হঠাৎ চোখ পড়ে খাটের কোনায়—
একটা বই, একটা গোলাপি ফ্রেমের চশমা, আর সাদা কভারে মোড়া তার মোবাইল ফোনটি।
আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেদিকে... ঠিক তখনই......
...ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। হঠাৎ মোবাইলের আলো জ্বলে উঠল।
কিন্তু ততক্ষণে আমি ঘর ছাড়িয়ে গেছি।
আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সেই গাছটার নিচে — যেখানে সে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে কথা বলত আমার সাথে।
সেই গাছের নিচেই একটি সমাধি।
নামে খোদাই করা — “মৃত্তিকা রায়”, মৃত্যুর তারিখ... আট বছর আগে।
আমি ফিরলাম। নির্বাক, নিস্তব্ধ।
ফিরে আসার আগে কিছুক্ষণ তার প্রিয় গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম।
সমাধির চারপাশে লাল ফুল ছড়িয়ে রেখেছে কেউ।
আমি নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকি, সেই শিলালিপির দিকে।
খোদাই করা —
মৃত্তিকা।
তার গলা এখনও বাতাসে ভেসে আসে।
তার স্পর্শ নেই, ছায়া নেই, তবু অনুভব রয়ে গেছে — গভীর, অনাড়ম্বর, অথচ অমলিন।
তার নাম ছিল ‘মৃত্তিকা’ — মাটি, ধরণী, আর অস্তিত্বের শেষ রেখার মাঝের এক মায়াময় নাম।
আমি জানি, সে এখনো কথা বলে — বাতাসে, ঘ্রাণে, নীরব বার্তায়।
তার প্রিয় একটি কথা ছিল — “যা অস্তিত্বে নেই, কিন্তু অনুভবে থাকে।”
তিন দিন পর মাঝরাতে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।
একটা মেসেজ এল—
“বাড়িতে একটু সমস্যা ছিল, তাই ফোনে আসতে পারিনি।”
নামটা দেখলাম।
মৃত্তিকা।।
লেখিকা: [আপেল]
সে ছিল এক শুভ্র ক্যানভাস — যেন কোনো শিল্পীর তুলি থেমে গিয়েছিল অসময়ের ঠিক আগমুহূর্তে।
ঠোঁটজোড়া গোলাপি কাগজের মতো কোমল, চোখ দুটি অদ্ভুত এক ফ্যাকাসে রঙে রঞ্জিত — যেন বাস্তবের নয়, বরং কোনো কল্পলোকের বাসিন্দা।
তার স্বভাব ছিল বর্ষার মতো — শান্ত, শীতল, গভীর।
তার গলার স্বর মিশে যেত বাতাসে। যেন সে সত্যিই বাতাসের কন্যা—এক অপার রূপসী মৃত্তিকা, যার গায়ের রং যেন নরম বরফ, আর গাল দুটি সদ্য ফোটা পদ্মফুলের মতো।
আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম।
পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
আমাদের আলাপ হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। প্রথমে বন্ধুত্ব হয়, তারপর আস্তে আস্তে আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ি।
প্রতিদিন কথা হতো আমাদের — হাসি-কান্না, রাগ-ভালোবাসায় গাঁথা সম্পর্ক, যা গড়ে উঠেছিল দেখা ছাড়াই।
মৃত্তিকা থাকত অন্য শহরে। তার বাড়ির ঠিকানা জানতাম, তার পরিবারের সঙ্গেও কথা হয়েছে আমার বহুবার।
সে বলত, প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছাদে বাড়ির পেছনের সেই পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে বসে আমার সঙ্গে কথা বলে। এটি তার খুব প্রিয় একটি যায়গা।
খুব বিশ্বাস করতাম আমি তাকে—চোখ বুঁজে, নিঃসংকোচে।
একদিন হঠাৎ কাজ পড়ে গেল সেই শহরে। না জানিয়েই গেলাম। জানালে দেখা করতে চাইত না, তাই... চুপিচুপি গেলাম।
সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই গাছটার নিচে — যেমনটা সে বলত, তেমনই বিশাল, নীরব এক বৃক্ষ।
বাড়ির পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি ফোন করলাম তাকে—রিসিভ করল না।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম অপেক্ষা করলাম।
সময় অল্প ছিল। শেষমেশ দরজায় কড়া নাড়লাম।
দরজা খুললেন এক মাঝবয়সী নারী—মৃত্তিকার মা।
সব বললাম—আমাদের সম্পর্ক, সেই অদেখা ভালোবাসার কথা।
তিনি শুধু তাকিয়ে রইলেন নিঃশব্দে। তারপর বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন আমায়।
ঘরভর্তি নিঃশব্দতা, যেন প্রত্যেকে কিছু জানে, কিন্তু বলতে পারছে না আমায়।
একটা ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন— গোলাপী সাদা রঙে মোড়ানো ঘরটি পুরনো আসবাবে সাজানো, পরিপাটি।
বিছানার পাশে টেবিলটিতে এখনও রাখা তার প্রিয় কফির কাপটি —
সে বলতো রাতে পড়াশোনার ফাঁকে মাঝেমাঝেই সে কফি হাতে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াত,
আকাশপানে তাকিয়ে থাকত একমনে। দেখতো তার প্রিয় কৃষ্ণচূড়া গাছটিকে।
সে বলেছিলো পারফিউম ব্যবহার করত না সে বিশেষ একটি কারনে, কিন্তু একটা বিশেষ পারফিউম খুব পছন্দ তার।
তার সাথে কথা বলার সময় হালকা লোটাসের মিষ্টি একটা গন্ধ সবসময় আমার আশপাশে ছড়িয়ে পড়তো।
দেখলাম ড্রেসিং টেবিলের উপর ছিল একটা ছোট গোলাপি কাচের শিশি — তাতে লেখা “Lotus”।
পেইন্টিং করতে খুব ভালবাসতো মৃত্তিকা তার আঁকা কিছু পেইন্টিং এখনো ফ্রেম করে টাঙানো দেওয়ালে
— ব্যালকনির পাশের জায়গাটিতে একটি ধাতব স্ট্যান্ড, যেটির ওপর চিত্র আঁকার বোর্ড বসানো একটি অসমাপ্ত পেইন্টিং রয়েছে তাতে। পাশের একটি ছোট্ট টেবিলে রাখা রয়েছে রং তুলি।
স্পষ্ট নয়, তবে বোঝা যায়, হয়তো কোনো পুরুষের মুখাবয়ব আঁকা —
আধফোঁটা, অসমাপ্ত।
তখনই হঠাৎ একজন বলে উঠলেন —
“মৃত্তিকা তো আট বছর আগেই মারা গেছে।”
শোনো মাত্রই সব কিছু ঘুরপাক খেতে লাগল মাথার ভিতর।
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম সেই ব্যাক্তির দিকে।
আমাকে তার মৃত্যুসনদপত্র দেখানো হলো।
কিছুক্ষণ পর আমায় একা রেখে বেড়িয়ে গেল তারা।
আমি কিছুতেই কিছু বিশ্বাস করতে পারছি না। কি হচ্ছে এসব? কি বলছেন তারা এগুলো?
ব্যালকনির পর্দার পেছনে হঠাৎ একটা ছায়া সরে গেল —
সঙ্গে ভেসে এল সেই চেনা মিষ্টি সেই লোটাসের সুবাস।
আমি তাকিয়ে দেখলাম — কিছু ছিল না সেখানে। তবু যেন কিছু থেকে গেল।
অদেখা।
ঘরের সব কিছুর মধ্যে তার স্পর্শ ছিল — কোনো কিছুই অযত্নে রাখত না সে।
আজও প্রতিটা জিনিস নিখুঁতভাবে সাজানো, যেন কেউ প্রতিদিন যত্ন করে গুছিয়ে রাখে।
ঘরে ছিল একটা বহু পুরনো আয়না — সেই আয়না সম্পর্কে বলেছিল সে আমায়, “এটা আমার খুব প্রিয়।”
আমি চমৎকৃত হয়ে তাকিয়ে দেখি। কি অপরূপ সুন্দর আয়নাটি।
হঠাৎ চোখ পড়ে খাটের কোনায়—
একটা বই, একটা গোলাপি ফ্রেমের চশমা, আর সাদা কভারে মোড়া তার মোবাইল ফোনটি।
আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেদিকে... ঠিক তখনই......
...ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। হঠাৎ মোবাইলের আলো জ্বলে উঠল।
কিন্তু ততক্ষণে আমি ঘর ছাড়িয়ে গেছি।
আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সেই গাছটার নিচে — যেখানে সে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে কথা বলত আমার সাথে।
সেই গাছের নিচেই একটি সমাধি।
নামে খোদাই করা — “মৃত্তিকা রায়”, মৃত্যুর তারিখ... আট বছর আগে।
আমি ফিরলাম। নির্বাক, নিস্তব্ধ।
ফিরে আসার আগে কিছুক্ষণ তার প্রিয় গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম।
সমাধির চারপাশে লাল ফুল ছড়িয়ে রেখেছে কেউ।
আমি নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকি, সেই শিলালিপির দিকে।
খোদাই করা —
মৃত্তিকা।
তার গলা এখনও বাতাসে ভেসে আসে।
তার স্পর্শ নেই, ছায়া নেই, তবু অনুভব রয়ে গেছে — গভীর, অনাড়ম্বর, অথচ অমলিন।
তার নাম ছিল ‘মৃত্তিকা’ — মাটি, ধরণী, আর অস্তিত্বের শেষ রেখার মাঝের এক মায়াময় নাম।
আমি জানি, সে এখনো কথা বলে — বাতাসে, ঘ্রাণে, নীরব বার্তায়।
তার প্রিয় একটি কথা ছিল — “যা অস্তিত্বে নেই, কিন্তু অনুভবে থাকে।”
তিন দিন পর মাঝরাতে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।
একটা মেসেজ এল—
“বাড়িতে একটু সমস্যা ছিল, তাই ফোনে আসতে পারিনি।”
নামটা দেখলাম।
মৃত্তিকা।।