কেন বন্ধু বন্ধুকে বুঝতে পারে না, প্রেম প্রেমকে বুঝতে পারে না, প্রেম আর বন্ধুত্ব একে অন্যের ভাষা ধরতে পারে না? কেন একটা সম্পর্ক আরেকটা সম্পর্ককে দেখে মনে মনে বলে এটা আমার মতো না? কেন একটা কমিউনিটি আরেকটা কমিউনিটির যন্ত্রণাকে দূর থেকে দেখে, কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখতে পারে না? এমনকি এক সংখ্যালঘু আরেক সংখ্যালঘুর কষ্টও কেন পুরোটা বুঝে উঠতে পারে না চেতনে আর মননে?
বিষয়টা আরও অদ্ভুত লাগে তখন, যখন দেখা যায় দুজন মানুষ সারাদিন একসঙ্গে থাকে। একই ঘরে বসে, একই রাস্তায় হাঁটে, একই চায়ের দোকানে বসে কথা বলে। বছরের পর বছর একসঙ্গে জীবন কাটিয়েছে। জীবনের বড় বড় ধাক্কাগুলো একসঙ্গে সামলেছে। কারও মৃত্যু, কারও সাফল্য, কারও ব্যর্থতার নীরব সময় সবই ভাগ করে নিয়েছে। শ্মশান থেকে সম্মেলন সব জায়গায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকেছে। একে অন্যের অন্ধকার দেখেছে, আবার উজ্জ্বল দিনগুলোও একসঙ্গে দেখেছে।
তাহলে কি এরা আত্মার আত্মীয় নয়?
আর যদি না হয়, তাহলে আত্মীয়তা আসলে কী?
তবু এত কিছুর পরেও একটা সময় আসে, যখন একজন আরেকজনকে খুব সাধারণভাবে বলে দেয়, প্রায় বিরক্ত হয়ে বলে দেয়, থাক তুই বুঝবি না।
এই কথাটার ভেতরে কিন্তু অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে।
আমাদের মাথার ভেতর সারাক্ষণ যে চিন্তার কোলাহল চলে, এলোমেলো ভাব, স্মৃতি, ভয়, অপরাধবোধ, ইচ্ছা আর রাগ সব একসঙ্গে জট পাকিয়ে থাকে। এই স্রোত আমাদের রাতে ঘুমোতে দেয় না, দিনে কাজে মন বসতে দেয় না। অথচ এই জটের পুরো মানচিত্র কি আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি? বেশিরভাগ সময় পারি না। আমরা শুধু বুঝি কিছু একটা ঠিক নেই, কিন্তু ঠিক কী, সেটা ধরতে পারি না।
তাহলে এমন কী বিশ্বাস থেকে আমরা ধরে নিই যে আরেকজন মানুষ এসে আমাদের মনের এই জটের একদম তল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে? যে স্রোতে আমরা নিজেরাই ঠিকভাবে সাঁতার কাটতে পারি না, সেখানে অন্য কেউ খুব সহজে পারবে এই আশা কি একটু বেশি না?
এই ধরে নেওয়ার পেছনে সম্ভবত দুটো বাস্তব কারণ আছে।
একটা হলো ক্লান্তি। কাউকে নিজের ভেতরের সবকিছু বোঝাতে গেলে সময় লাগে, এনার্জি লাগে, ধৈর্য লাগে। বারবার থামতে হয়, ব্যাখ্যা করতে হয়, ভুল বোঝাবুঝি ঠিক করতে হয়। অনেক সময় আমরা সেই পরিশ্রমটাই করতে চাই না। তাই আগেই বলে দিই, থাক তুই বুঝবি না।
আরেকটা কারণ আরও গভীর। আমরা ভিতরে ভিতরে বিশ্বাস করি যে এই জায়গাটায় আমি একাই। যত কাছের মানুষই হোক, কিছু ভাবনা শেষ পর্যন্ত একারই থেকে যায়। এই উপলব্ধিটাই একটা অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা তৈরি করে। এমন নিঃসঙ্গতা যা ভিড়ের মধ্যেও আরও তীব্র লাগে।
এই নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা দিকশূন্য হয়ে পড়ি। মনে হয় আমি একা দাঁড়িয়ে আছি এই শহরের মাঝখানে। চারপাশে মানুষ আছে, আলো আছে, শব্দ আছে। তবু নিজের ভেতরের জটিলতা, সংকট আর কান্নাগুলো একান্তই আমার। এই কান্নাগুলো ছড়িয়ে পড়ে, উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ে ধাক্কা খেয়ে বেঁকে যায়। আমার চেতনাটাও ঠিক তেমনই। আলাদা, কিন্তু একা।
আমরা খুব সহজে বলি individual is unique। কথাটা শুনতে ভালো লাগে, বলতে সহজ। কিন্তু বারবার শুনতে শুনতে এই বাক্যটাই যেন একটা ধারালো অস্ত্র হয়ে গেছে। হ্যাঁ, প্রতিটা মানুষ আলাদা। তাই শেখার পদ্ধতি আলাদা, আচরণ আলাদা, পছন্দ আর অপছন্দ আলাদা, ভালোবাসা প্রকাশ করার ধরনও আলাদা। কেউ সমস্যা এড়িয়ে চলে, কেউ সরাসরি মুখোমুখি দাঁড়ায়। কারও ইতিহাস আলাদা, কারও পরিবেশ আলাদা, কারও সংস্কৃতি আর সংস্কার আলাদা।
এই কারণেই সবার অভাব একরকম হয় না, অভিযোগও একরকম হওয়ার কথা নয়। তাই বলা হয় সবাইকে এক মাপে মাপা যায় না। এমনকি সমাজ বা প্রশাসনের নীতিও আলাদা হওয়া দরকার।
মোদ্দা কথা হলো কেউই কার্বন কপি নয়।
ঠিক এই জায়গা থেকেই আসে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য কথাটা। শুনতে খুব সুন্দর, খুব ব্যালান্সড লাগে। কিন্তু বাস্তবে এই ঐক্য অনেক সময় একটু অস্বস্তিকর। যেন সবাইকে একসঙ্গে ধরে রাখার জন্য একটা ঢিলেঢালা সুতো। বাইরে থেকে মনে হয় সবাই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, একই লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকে নিজের মতো করে টান দিচ্ছে। কোথাও শিকড় আলগা হয়ে যাচ্ছে, কোথাও ছিঁড়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত থেকে যায় এই সত্যটাই।
প্রত্যেকে আলাদা। প্রত্যেকে ইউনিক। আর অনেক সময় প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একা।
বিষয়টা আরও অদ্ভুত লাগে তখন, যখন দেখা যায় দুজন মানুষ সারাদিন একসঙ্গে থাকে। একই ঘরে বসে, একই রাস্তায় হাঁটে, একই চায়ের দোকানে বসে কথা বলে। বছরের পর বছর একসঙ্গে জীবন কাটিয়েছে। জীবনের বড় বড় ধাক্কাগুলো একসঙ্গে সামলেছে। কারও মৃত্যু, কারও সাফল্য, কারও ব্যর্থতার নীরব সময় সবই ভাগ করে নিয়েছে। শ্মশান থেকে সম্মেলন সব জায়গায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকেছে। একে অন্যের অন্ধকার দেখেছে, আবার উজ্জ্বল দিনগুলোও একসঙ্গে দেখেছে।
তাহলে কি এরা আত্মার আত্মীয় নয়?
আর যদি না হয়, তাহলে আত্মীয়তা আসলে কী?
তবু এত কিছুর পরেও একটা সময় আসে, যখন একজন আরেকজনকে খুব সাধারণভাবে বলে দেয়, প্রায় বিরক্ত হয়ে বলে দেয়, থাক তুই বুঝবি না।
এই কথাটার ভেতরে কিন্তু অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে।
আমাদের মাথার ভেতর সারাক্ষণ যে চিন্তার কোলাহল চলে, এলোমেলো ভাব, স্মৃতি, ভয়, অপরাধবোধ, ইচ্ছা আর রাগ সব একসঙ্গে জট পাকিয়ে থাকে। এই স্রোত আমাদের রাতে ঘুমোতে দেয় না, দিনে কাজে মন বসতে দেয় না। অথচ এই জটের পুরো মানচিত্র কি আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি? বেশিরভাগ সময় পারি না। আমরা শুধু বুঝি কিছু একটা ঠিক নেই, কিন্তু ঠিক কী, সেটা ধরতে পারি না।
তাহলে এমন কী বিশ্বাস থেকে আমরা ধরে নিই যে আরেকজন মানুষ এসে আমাদের মনের এই জটের একদম তল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে? যে স্রোতে আমরা নিজেরাই ঠিকভাবে সাঁতার কাটতে পারি না, সেখানে অন্য কেউ খুব সহজে পারবে এই আশা কি একটু বেশি না?
এই ধরে নেওয়ার পেছনে সম্ভবত দুটো বাস্তব কারণ আছে।
একটা হলো ক্লান্তি। কাউকে নিজের ভেতরের সবকিছু বোঝাতে গেলে সময় লাগে, এনার্জি লাগে, ধৈর্য লাগে। বারবার থামতে হয়, ব্যাখ্যা করতে হয়, ভুল বোঝাবুঝি ঠিক করতে হয়। অনেক সময় আমরা সেই পরিশ্রমটাই করতে চাই না। তাই আগেই বলে দিই, থাক তুই বুঝবি না।
আরেকটা কারণ আরও গভীর। আমরা ভিতরে ভিতরে বিশ্বাস করি যে এই জায়গাটায় আমি একাই। যত কাছের মানুষই হোক, কিছু ভাবনা শেষ পর্যন্ত একারই থেকে যায়। এই উপলব্ধিটাই একটা অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা তৈরি করে। এমন নিঃসঙ্গতা যা ভিড়ের মধ্যেও আরও তীব্র লাগে।
এই নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা দিকশূন্য হয়ে পড়ি। মনে হয় আমি একা দাঁড়িয়ে আছি এই শহরের মাঝখানে। চারপাশে মানুষ আছে, আলো আছে, শব্দ আছে। তবু নিজের ভেতরের জটিলতা, সংকট আর কান্নাগুলো একান্তই আমার। এই কান্নাগুলো ছড়িয়ে পড়ে, উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ে ধাক্কা খেয়ে বেঁকে যায়। আমার চেতনাটাও ঠিক তেমনই। আলাদা, কিন্তু একা।
আমরা খুব সহজে বলি individual is unique। কথাটা শুনতে ভালো লাগে, বলতে সহজ। কিন্তু বারবার শুনতে শুনতে এই বাক্যটাই যেন একটা ধারালো অস্ত্র হয়ে গেছে। হ্যাঁ, প্রতিটা মানুষ আলাদা। তাই শেখার পদ্ধতি আলাদা, আচরণ আলাদা, পছন্দ আর অপছন্দ আলাদা, ভালোবাসা প্রকাশ করার ধরনও আলাদা। কেউ সমস্যা এড়িয়ে চলে, কেউ সরাসরি মুখোমুখি দাঁড়ায়। কারও ইতিহাস আলাদা, কারও পরিবেশ আলাদা, কারও সংস্কৃতি আর সংস্কার আলাদা।
এই কারণেই সবার অভাব একরকম হয় না, অভিযোগও একরকম হওয়ার কথা নয়। তাই বলা হয় সবাইকে এক মাপে মাপা যায় না। এমনকি সমাজ বা প্রশাসনের নীতিও আলাদা হওয়া দরকার।
মোদ্দা কথা হলো কেউই কার্বন কপি নয়।
ঠিক এই জায়গা থেকেই আসে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য কথাটা। শুনতে খুব সুন্দর, খুব ব্যালান্সড লাগে। কিন্তু বাস্তবে এই ঐক্য অনেক সময় একটু অস্বস্তিকর। যেন সবাইকে একসঙ্গে ধরে রাখার জন্য একটা ঢিলেঢালা সুতো। বাইরে থেকে মনে হয় সবাই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, একই লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকে নিজের মতো করে টান দিচ্ছে। কোথাও শিকড় আলগা হয়ে যাচ্ছে, কোথাও ছিঁড়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত থেকে যায় এই সত্যটাই।
প্রত্যেকে আলাদা। প্রত্যেকে ইউনিক। আর অনেক সময় প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একা।