HS এবং JEE-র মত বড় পরীক্ষাগুলো শেষ করে শুভ যখন বাবলি দিদির বাড়ি পৌঁছাল, মনে হচ্ছিল জীবনে প্রথমবার শ্বাস নিচ্ছে। বাবলি দি খুড়তুতো দিদি, শুভর মায়ের একান্ত ইচ্ছায় এই ছুটিটা কাটাতে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাংলার ছোট্ট শহরটিতে, যেখানে সময় যেনো নদীর জলের মতো ধীরে বয়ে চলে।
বাবলি দির বাড়িতে চলছিল একটি পড়ার অনুষ্ঠান—স্থানীয় স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আলোচনা সভা। সেখানে প্রথম দেখা সঞ্চিতার সাথে। সে বসেছিল এক কোণে, স্কুলের ইউনিফর্মেই, সাদা-নীল শার্ট-স্কার্ট, চুলগুলো পিঠ ময় ছড়িয়ে আছে। বইয়ের পাতায় নিমগ্ন, মাঝে মাঝেই চোখ তুলে কারো কথার যুক্তি বিচার করছে। তার চোখে ছিল এক ধরণের পরিণত দৃষ্টি, বয়সের তুলনায় যেনো বেশি বোঝা, বেশি সচেতনতা।
শুভ ধীরে ধীরে জেনেছিল—সঞ্চিতা ক্লাস টেনের ছাত্রী, বাবলি দির কাকিমার বাড়ির পাশের বাড়ির মেয়ে, বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বইপড়া আর তার বাগানের গাছ নিয়ে যার সবচেয়ে বেশি মোহ। কথায় কথায় বিস্ময়কর পরিণতি তার মধ্যে, কিন্তু শুভর উপস্থিতিতেই যেনো সে অন্য রূপ ধারণ করে।
পড়ার অনুষ্ঠান শেষে চায়ের টেবিলে সকলে গল্প করছিল। শুভ, বলল, "আমার মনে হয় গণিত আর সঙ্গীতে মিল আছে—দুটোই সুরের কথা বলে।"
সঞ্চিতা পাতার চা নাড়তে নাড়তে বলল, "মজার কথা। কিন্তু গণিত নিখুঁত সমাধানের কথা বলে, আর সঙ্গীত নিখুঁত অনুভূতির। এটা মিল না, পার্থক্য।" তারপর একটু হেসে বলল, "যাইহোক, তুমি তো এবার কলেজে যাবে, আমাদের মতো স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দর্শন এখন তুমি জানবে না।" সবার হাসির মধ্যেই সে উঠে বই গুছিয়ে নিল।
বাবলি দির বাড়ির পিছনের আমতলায় একদিন দেখা। সঞ্চিতা একটা পুরনো আমগাছের তলায় বসে গণিতের সমস্যা সমাধান করছিল। শুভ কাছে গিয়ে বলল, "কিছু সাহায্য লাগবে?"
সঞ্চিতা না তাকিয়েই বলল, "না, ধন্যবাদ। নিজে করতে পারলে ভালো শেখা যায়।"
শুভ জেদ করে বলল, "কিন্তু কখনো কখনো সাহায্য নেওয়াও শেখার অংশ।"
সঞ্চিতা শেষ পর্যন্ত তাকাল, তার দৃষ্টিতে একধরনের কঠিন সততা, "তুমি মেধাবী, আমি তোমার মতো মেধাবী নয়। আমাদের লেভেল আলাদা, শুভদা।" 'দা' শব্দটা ব্যবহার করেই সে যেনো একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল।
একদিন বিকেলে গ্রামের পুকুরপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে শুভ সরাসরি বলল, "তুমি কি সবাইকে এত দূরে রাখো, নাকি শুধু আমাকে?"
সঞ্চিতা পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বলল, "সব দূরত্ব, দূরের হয় না, শুভদা। তা ছাড়াও তুমি অনেক মেধাবী, তোমার জীবনের পথ আলাদা, আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এই দূরত্বটা স্বাভাবিক।"
"মেধা দিয়ে সব মাপা যায় না, সঞ্চিতা।"
"না," সে বলল, "কিন্তু সময় দিয়ে মাপা যায়। তোমার সময় এখন উচ্চশিক্ষার, আমার সময় এখন বোর্ড পরীক্ষার। দুটো সময় পাশাপাশি চলে না।" বলেই সে ফিরে যেতে শুরু করল।
শুভ বুঝতে পারছিল না। সঞ্চিতা বাকি সবার সঙ্গে হাসে, গল্প করে, পড়ার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে—কিন্তু তার কাছাকাছি এলেই যেনো বদলে যায়। কোনো শিষ্ট কিন্তু শীতল ভদ্রতা, বা সরাসরি সরে যাওয়া। শুভর মনটা কেমন করে উঠত, এই অল্প বয়সী মেয়েটির মধ্যে যেনো এক প্রাক্তন প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে।
জুন মাসে রেজাল্ট আসল। শুভ খড়গপুর IIT-তে কম্পিউটার সায়েন্সে চান্স পেয়ে গেল। আনন্দে সবাই আত্মহারা, কিন্তু শুভর মনে হচ্ছিল কোনো অসমাপ্ত সুর বাজছে। সে স্থির করল, যাওয়ার আগে একবার সরাসরি জিজ্ঞেস করবে।
বাবলি দির বাড়ির ছাদে সন্ধ্যায় তারা দুজন দাঁড়িয়েছিল। শুভ বলল, "আমি কাল চলে যাচ্ছি।"
সঞ্চিতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল, "জানি। শুভকামনা রইল।"
"তোমার কিছু বলার নেই?"
সঞ্চিতা গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল, "আমি ক্লাস টেনের ছাত্রী, শুভদা। আমার জীবন এখন একটা বাক্সের মধ্যে—বোর্ড পরীক্ষা, রেজাল্ট, তারপর উচ্চমাধ্যমিক। তুমি বিশ্বের দরজা খুলে দিয়েছ। আমি... আমি এখনো সেই বাক্সেই আটকে।"
"তুমি জানো বাক্স থেকে বের হওয়ারও একটা সময় আসে।"
"হ্যাঁ," সে মৃদু হাসল, প্রথমবার শুভর দিকে সরাসরি তাকিয়ে, "কিন্তু সেই সময় এখন না। তোমার সময় এখন, আমার সময় তখন।" তার চোখে একটু শিশুসুলভ করুণা, একটু প্রাপ্তবয়স্কের বেদনা।
শুভ কিছু বলতে গিয়েও বলল না। সে বুঝতে পারল, মনের এই ব্যবধান নয়, জীবনের নিছক মেধার ব্যবধানটা আসল বাধা ওর মনে।
IIT-তে জীবন শুরু হয়ে গেল। ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট, কোডিং—জীবন এমন ব্যস্ত হয়ে উঠল যে দিনরাত এক হয়ে যেতে লাগল। মাঝে মাঝেই বাবলি দির ফোন আসে, খবর নেয়। এক বছর পর একদিন ফোনে বাবলি দি বলল, "শুভ, সঞ্চিতা তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে।"
শুভ অবাক হল, "সত্যি? সে তো আমার থেকে সব সময় দূরে সরে থাকত, আমাকে এড়িয়ে চলত , যে এড়িয়ে এড়িয়ে চলে সে খোঁজ নেওয়ার তো কথা না।"
"সে এখন বদলে গেছে। বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছে, ভালো রেজাল্ট করেছে। তোমার জন্য একটা ছোট গিফট রেখে গেছে—একটা প্রোগ্রামিং এর বই। বলে, 'দিদি, শুভদা কি এখনো কোডিং নিয়েই ব্যস্ত?'"
শুভর বুকে একটু নাড়া দিল, কিন্তু সে বলল, "দিদি, তুমি তো জানো, আমি ওর কাছে যেতে চেয়েছিলাম, ও আমাকে সুযোগই দেয়নি। ফিলিংস গাছের মতো—জমি পেলে তবে বাড়ে। সে জমি দেয়নি, কারণ আমরা দুইটা আলাদা ধাপে ছিলাম। এখন আমার জীবন অন্য রকম ব্যস্ত।"
বাবলি দি নিশ্বাস ফেলে বলল, "সে ভেবেছিল বয়সের ব্যবধান, জীবনের ধাপের পার্থক্য—এগুলো খুব বড় ব্যাপার। এখন বুঝেছে, সময় সবকিছু বদলে দেয়। কিন্তু সময় তো কখনো ফিরে আসে না।"
শুভ জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে তারাগুলো যেনো বাংলার সেই ছোট শহরেরই তারা। বলল, "জীবন এখন অন্য রকম ব্যস্ত, দিদি। আমি যে পথে আছি, তাতে ফিরে তাকানোর সময় নেই। যে মুহূর্তে সে সুযোগটা দেয়নি, সেটাই শেষ কথা। ফিলিংস গ্রো করার মত স্পেস আর সময় আমার জীবনে এখন নেই।"
ফোন রেখে শুভ ল্যাপটপ খুলে বসল। স্ক্রিনে কোডের লাইনগুলো ঝলমল করছিল। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে সেই আমগাছের তলায় বসে থাকা ক্লাস টেনের মেয়েটির কথা, যে বয়সে ছোট হলেও দৃষ্টিতে ছিল বিশাল এক পরিণতি।
আর বাংলার সেই ছোট শহরে, সঞ্চিতা নতুন স্কুলের ইউনিফর্ম পরেছে—উচ্চমাধ্যমিকের। সে গণিতের নতুন বইয়ের পাতায় কিছু লিখছে, হঠাৎ থামে। জানালার বাইরে তাকায়। কতদূরে আছে খড়গপুর? কতদূরে আছে সেই শুভদা? সে একটা অঙ্ক কষছে মনে মনে—বয়সের ব্যবধান তো কমবে, কিন্তু সময়ের ব্যবধান কি কখনো কমে?
জীবনের সব সম্পর্ক নির্মাণ হয় না, কিছু সম্পর্ক শুধুই একটি সম্ভাবনা থেকে যায়—একটি সুন্দর, বেদনাদায়ক,
অসমাপ্ত সুরের মতো, যা শুধুই মনে বাজে, কানে নয়।
বাবলি দির বাড়িতে চলছিল একটি পড়ার অনুষ্ঠান—স্থানীয় স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আলোচনা সভা। সেখানে প্রথম দেখা সঞ্চিতার সাথে। সে বসেছিল এক কোণে, স্কুলের ইউনিফর্মেই, সাদা-নীল শার্ট-স্কার্ট, চুলগুলো পিঠ ময় ছড়িয়ে আছে। বইয়ের পাতায় নিমগ্ন, মাঝে মাঝেই চোখ তুলে কারো কথার যুক্তি বিচার করছে। তার চোখে ছিল এক ধরণের পরিণত দৃষ্টি, বয়সের তুলনায় যেনো বেশি বোঝা, বেশি সচেতনতা।
শুভ ধীরে ধীরে জেনেছিল—সঞ্চিতা ক্লাস টেনের ছাত্রী, বাবলি দির কাকিমার বাড়ির পাশের বাড়ির মেয়ে, বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বইপড়া আর তার বাগানের গাছ নিয়ে যার সবচেয়ে বেশি মোহ। কথায় কথায় বিস্ময়কর পরিণতি তার মধ্যে, কিন্তু শুভর উপস্থিতিতেই যেনো সে অন্য রূপ ধারণ করে।
পড়ার অনুষ্ঠান শেষে চায়ের টেবিলে সকলে গল্প করছিল। শুভ, বলল, "আমার মনে হয় গণিত আর সঙ্গীতে মিল আছে—দুটোই সুরের কথা বলে।"
সঞ্চিতা পাতার চা নাড়তে নাড়তে বলল, "মজার কথা। কিন্তু গণিত নিখুঁত সমাধানের কথা বলে, আর সঙ্গীত নিখুঁত অনুভূতির। এটা মিল না, পার্থক্য।" তারপর একটু হেসে বলল, "যাইহোক, তুমি তো এবার কলেজে যাবে, আমাদের মতো স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দর্শন এখন তুমি জানবে না।" সবার হাসির মধ্যেই সে উঠে বই গুছিয়ে নিল।
বাবলি দির বাড়ির পিছনের আমতলায় একদিন দেখা। সঞ্চিতা একটা পুরনো আমগাছের তলায় বসে গণিতের সমস্যা সমাধান করছিল। শুভ কাছে গিয়ে বলল, "কিছু সাহায্য লাগবে?"
সঞ্চিতা না তাকিয়েই বলল, "না, ধন্যবাদ। নিজে করতে পারলে ভালো শেখা যায়।"
শুভ জেদ করে বলল, "কিন্তু কখনো কখনো সাহায্য নেওয়াও শেখার অংশ।"
সঞ্চিতা শেষ পর্যন্ত তাকাল, তার দৃষ্টিতে একধরনের কঠিন সততা, "তুমি মেধাবী, আমি তোমার মতো মেধাবী নয়। আমাদের লেভেল আলাদা, শুভদা।" 'দা' শব্দটা ব্যবহার করেই সে যেনো একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল।
একদিন বিকেলে গ্রামের পুকুরপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে শুভ সরাসরি বলল, "তুমি কি সবাইকে এত দূরে রাখো, নাকি শুধু আমাকে?"
সঞ্চিতা পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বলল, "সব দূরত্ব, দূরের হয় না, শুভদা। তা ছাড়াও তুমি অনেক মেধাবী, তোমার জীবনের পথ আলাদা, আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এই দূরত্বটা স্বাভাবিক।"
"মেধা দিয়ে সব মাপা যায় না, সঞ্চিতা।"
"না," সে বলল, "কিন্তু সময় দিয়ে মাপা যায়। তোমার সময় এখন উচ্চশিক্ষার, আমার সময় এখন বোর্ড পরীক্ষার। দুটো সময় পাশাপাশি চলে না।" বলেই সে ফিরে যেতে শুরু করল।
শুভ বুঝতে পারছিল না। সঞ্চিতা বাকি সবার সঙ্গে হাসে, গল্প করে, পড়ার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে—কিন্তু তার কাছাকাছি এলেই যেনো বদলে যায়। কোনো শিষ্ট কিন্তু শীতল ভদ্রতা, বা সরাসরি সরে যাওয়া। শুভর মনটা কেমন করে উঠত, এই অল্প বয়সী মেয়েটির মধ্যে যেনো এক প্রাক্তন প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে।
জুন মাসে রেজাল্ট আসল। শুভ খড়গপুর IIT-তে কম্পিউটার সায়েন্সে চান্স পেয়ে গেল। আনন্দে সবাই আত্মহারা, কিন্তু শুভর মনে হচ্ছিল কোনো অসমাপ্ত সুর বাজছে। সে স্থির করল, যাওয়ার আগে একবার সরাসরি জিজ্ঞেস করবে।
বাবলি দির বাড়ির ছাদে সন্ধ্যায় তারা দুজন দাঁড়িয়েছিল। শুভ বলল, "আমি কাল চলে যাচ্ছি।"
সঞ্চিতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল, "জানি। শুভকামনা রইল।"
"তোমার কিছু বলার নেই?"
সঞ্চিতা গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল, "আমি ক্লাস টেনের ছাত্রী, শুভদা। আমার জীবন এখন একটা বাক্সের মধ্যে—বোর্ড পরীক্ষা, রেজাল্ট, তারপর উচ্চমাধ্যমিক। তুমি বিশ্বের দরজা খুলে দিয়েছ। আমি... আমি এখনো সেই বাক্সেই আটকে।"
"তুমি জানো বাক্স থেকে বের হওয়ারও একটা সময় আসে।"
"হ্যাঁ," সে মৃদু হাসল, প্রথমবার শুভর দিকে সরাসরি তাকিয়ে, "কিন্তু সেই সময় এখন না। তোমার সময় এখন, আমার সময় তখন।" তার চোখে একটু শিশুসুলভ করুণা, একটু প্রাপ্তবয়স্কের বেদনা।
শুভ কিছু বলতে গিয়েও বলল না। সে বুঝতে পারল, মনের এই ব্যবধান নয়, জীবনের নিছক মেধার ব্যবধানটা আসল বাধা ওর মনে।
IIT-তে জীবন শুরু হয়ে গেল। ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট, কোডিং—জীবন এমন ব্যস্ত হয়ে উঠল যে দিনরাত এক হয়ে যেতে লাগল। মাঝে মাঝেই বাবলি দির ফোন আসে, খবর নেয়। এক বছর পর একদিন ফোনে বাবলি দি বলল, "শুভ, সঞ্চিতা তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে।"
শুভ অবাক হল, "সত্যি? সে তো আমার থেকে সব সময় দূরে সরে থাকত, আমাকে এড়িয়ে চলত , যে এড়িয়ে এড়িয়ে চলে সে খোঁজ নেওয়ার তো কথা না।"
"সে এখন বদলে গেছে। বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছে, ভালো রেজাল্ট করেছে। তোমার জন্য একটা ছোট গিফট রেখে গেছে—একটা প্রোগ্রামিং এর বই। বলে, 'দিদি, শুভদা কি এখনো কোডিং নিয়েই ব্যস্ত?'"
শুভর বুকে একটু নাড়া দিল, কিন্তু সে বলল, "দিদি, তুমি তো জানো, আমি ওর কাছে যেতে চেয়েছিলাম, ও আমাকে সুযোগই দেয়নি। ফিলিংস গাছের মতো—জমি পেলে তবে বাড়ে। সে জমি দেয়নি, কারণ আমরা দুইটা আলাদা ধাপে ছিলাম। এখন আমার জীবন অন্য রকম ব্যস্ত।"
বাবলি দি নিশ্বাস ফেলে বলল, "সে ভেবেছিল বয়সের ব্যবধান, জীবনের ধাপের পার্থক্য—এগুলো খুব বড় ব্যাপার। এখন বুঝেছে, সময় সবকিছু বদলে দেয়। কিন্তু সময় তো কখনো ফিরে আসে না।"
শুভ জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে তারাগুলো যেনো বাংলার সেই ছোট শহরেরই তারা। বলল, "জীবন এখন অন্য রকম ব্যস্ত, দিদি। আমি যে পথে আছি, তাতে ফিরে তাকানোর সময় নেই। যে মুহূর্তে সে সুযোগটা দেয়নি, সেটাই শেষ কথা। ফিলিংস গ্রো করার মত স্পেস আর সময় আমার জীবনে এখন নেই।"
ফোন রেখে শুভ ল্যাপটপ খুলে বসল। স্ক্রিনে কোডের লাইনগুলো ঝলমল করছিল। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে সেই আমগাছের তলায় বসে থাকা ক্লাস টেনের মেয়েটির কথা, যে বয়সে ছোট হলেও দৃষ্টিতে ছিল বিশাল এক পরিণতি।
আর বাংলার সেই ছোট শহরে, সঞ্চিতা নতুন স্কুলের ইউনিফর্ম পরেছে—উচ্চমাধ্যমিকের। সে গণিতের নতুন বইয়ের পাতায় কিছু লিখছে, হঠাৎ থামে। জানালার বাইরে তাকায়। কতদূরে আছে খড়গপুর? কতদূরে আছে সেই শুভদা? সে একটা অঙ্ক কষছে মনে মনে—বয়সের ব্যবধান তো কমবে, কিন্তু সময়ের ব্যবধান কি কখনো কমে?
জীবনের সব সম্পর্ক নির্মাণ হয় না, কিছু সম্পর্ক শুধুই একটি সম্ভাবনা থেকে যায়—একটি সুন্দর, বেদনাদায়ক,
অসমাপ্ত সুরের মতো, যা শুধুই মনে বাজে, কানে নয়।
